আগরতলার ভবিষ্যৎ জলচাহিদা মেটাতে গোমতী নদীকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
মিশন মোডে কাজের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
আগরতলা, ২৪ জুন : শুধুমাত্র বর্তমান প্রয়োজন নয়, আগামী কয়েক দশকের জলচাহিদার কথা মাথায় রেখে সমগ্র রাজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণে জোর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা। বুধবার আগরতলার এসপি মুখার্জি লেনস্থিত টিআইএফটি-র ওয়ার রুমে গোমতী নদীর জল ব্যবহার করে আগরতলা শহরে প্রস্তাবিত নতুন জল সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে তিনি এই নির্দেশ দেন।
বৈঠকের শুরুতে সুশাসন দফতরের সচিব কিরণ গিত্তে স্বচিত্র উপস্থাপনার মাধ্যমে আগরতলা শহরের বর্তমান পানীয়জল পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ চাহিদা, বিদ্যমান জল সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং গোমতী নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে রাজধানী শহরের পানীয়জলের একটি বড় অংশ ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং গ্রীষ্মকালীন জলসংকটের কারণে ভবিষ্যতে এই নির্ভরতা টেকসই হবে না। তাই বিকল্প ও স্থায়ী ভূপৃষ্ঠ জলভিত্তিক উৎস গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় উদয়পুরের মহারাণী ব্যারেজ এলাকা থেকে জল আহরণ, দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন, আধুনিক জলাধার নির্মাণ এবং জল পরিশোধন পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগরতলা শহরের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পানীয়জল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
উপস্থাপনার পর মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উদ্দেশে বলেন, “শুধু আগরতলা শহরের বর্তমান চাহিদার কথা ভাবলেই হবে না। আগামী দিনের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র রাজ্যের জন্য সুদূরপ্রসারী জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।” তিনি বলেন, পানীয়জলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে মিশন মোডে কাজ করতে হবে এবং জল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে জল অপচয় রোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন কারণে বিপুল পরিমাণ জল অপচয় হচ্ছে বা যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এই জলকে কীভাবে সংরক্ষণ ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে বর্ষাকালে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ওপরও তিনি জোর দেন।
তিনি বলেন, “প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলা যায়। সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা ও কার্যকর উদ্যোগ ভবিষ্যতের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দেয়।” এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৈঠকে গোমতী নদীভিত্তিক স্থায়ী জল সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি শুষ্ক মরশুমে পর্যাপ্ত জল সংরক্ষণের লক্ষ্যে পৃথক কাঁচা জলাধার (র’ ওয়াটার রিজার্ভয়ার) খননের সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত আধিকারিকদের মতে, এই ধরনের পরিকাঠামো গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে পানীয়জল সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়, বিধানসভার অধ্যক্ষ রামপদ জমাতিয়া, আগরতলা পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার, বিধায়ক অভিষেক দেবরায়, পানীয়জল ও স্বাস্থ্যবিধি দফতরের সচিব অভিষেক সিংহ, পূর্ত দফতরের সচিব পিকে গোয়েল, মুখ্যমন্ত্রীর ওএসডি পরমানন্দ সরকার ব্যানার্জী, আগরতলা স্মার্ট সিটি মিশনের অধিকর্তা এবং বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা আলোচ্য প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ জল ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন।
রাজ্যের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ এবং জলসম্পদের ওপর বাড়তে থাকা চাপের প্রেক্ষাপটে গোমতী নদীকেন্দ্রিক এই প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ভবিষ্যৎমুখী ও কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন প্রশাসনিক মহল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগরতলা শহরের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বৃহত্তর এলাকার পানীয়জল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
